যাত্রাবাড়ীর দনিয়া এলাকায় একটি পরিবারের বিরুদ্ধে কথিত মানি লন্ডারিং মামলা, বারবার পুলিশি তল্লাশি, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও হয়রানির ধারাবাহিকতার মধ্যে পরিবারের কর্তা মোঃ মনিরুজ্জামান গত বছরের ১৪ অক্টোবর গাজীপুরের টঙ্গী এলাকায় অবস্থানকালে আকস্মিকভাবে মারা যান।
পরিবারের অভিযোগ, পুলিশি হয়রানি ও হুমকির ধারাবাহিকতার মধ্যে তার মৃত্যুর পর টঙ্গী থানার পুলিশ পরিবারের সদস্যদের চাপ দিয়ে মৃত্যুকে স্বাভাবিক হিসেবে উল্লেখ করে একটি লিখিত আবেদন করিয়ে নেয়।
পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তাদের বড় ছেলে মোঃ মোস্তাফিজুর রহমান ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে সরকারবিরোধী আন্দোলনের সময় যাত্রাবাড়ী এলাকায় আন্দোলনকারীদের বিভিন্নভাবে সহায়তা করতেন। ওই সময় তিনি সাংবাদিক হাসান মেহেদীর মৃত্যুর ঘটনাও প্রত্যক্ষ করেন বলে পরিবারের দাবি। পরবর্তীতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি ওই ঘটনার বিষয়ে লেখেন এবং ঘটনার বিচার দাবি করেন।
পরিবারের অভিযোগ, এসব কর্মকাণ্ডের পর থেকেই পুলিশ মোস্তাফিজুর রহমানের বিষয়ে খোঁজখবর নিতে শুরু করে। কয়েক দফায় পুলিশ তাদের বাড়িতে গিয়ে তার অবস্থান ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে পরিবারের সদস্যদের জিজ্ঞাসাবাদ করে।
পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১০ আগস্ট পুলিশ প্রথম দফায় তাদের বাড়িতে গিয়ে মোস্তাফিজুর রহমানের বিষয়ে জানতে চায়। পরবর্তীতে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসেও পুলিশ তাকে থানায় হাজির করার জন্য পরিবারের সদস্যদের নির্দেশ দেয়।
এদিকে, ২০২৪ সালের অক্টোবর মাসে মোস্তাফিজুর রহমানের বাবা মোঃ মনিরুজ্জামানকে থানায় ডেকে নেওয়া হয় বলে পরিবার জানিয়েছে। পরিবারের অভিযোগ, সেখানে পুলিশের একজন কর্মকর্তা তার বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের সঙ্গে যোগাযোগ থাকার অভিযোগ তোলেন এবং তাকে আইনি ঝামেলা থেকে রক্ষা করার কথা বলে ২৫ লাখ টাকা দাবি করেন।
পরিবারের পক্ষ থেকে আরও জানানো হয়, ওই অর্থের দাবি নিয়ে মোঃ মনিরুজ্জামান পরবর্তীতে দুর্নীতি দমন কমিশনে অভিযোগ করেন। অভিযোগ করার পর সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তা তার প্রতি ক্ষুব্ধ হন এবং তাকে গুরুতর পরিণতির বিষয়ে সতর্ক করেন বলে পরিবারের অভিযোগ।
এরই মধ্যে মোস্তাফিজুর রহমান ২২ মার্চ ২০২৫ তারিখে উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে বিদেশে চলে যান। পরিবার জানিয়েছে, ২২ এপ্রিল ২০২৫ তারিখে তার, তার বাবা এবং ছোট ভাইয়ের বিরুদ্ধে একটি মানি লন্ডারিং মামলা দায়ের করা হয়। পরিবারের দাবি, মামলাটি ছিল ভিত্তিহীন এবং তাদের হয়রানি করার উদ্দেশ্যে দায়ের করা হয়েছিল। মামলা দায়েরের পরও পুলিশ কয়েক দফা তাদের বাড়িতে গিয়ে তল্লাশি চালায় বলে পরিবারের অভিযোগ।
১৩ অক্টোবর ২০২৫ তারিখে কয়েকজন পুলিশ সদস্য আবার তাদের যাত্রাবাড়ীর বাড়িতে যায় বলে পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন। পুলিশ সেখানে বিশেষভাবে মোঃ মনিরুজ্জামানকে খুঁজছিল বলে পরিবার দাবি করেছে। ওই সময় তিনি বাড়িতে উপস্থিত ছিলেন না।
পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, পুলিশের এই অভিযানের খবর পাওয়ার পর মোঃ মনিরুজ্জামান অত্যন্ত উদ্বিগ্ন ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন। সে সময় তিনি সাময়িকভাবে গাজীপুরের টঙ্গী এলাকায় অবস্থান করছিলেন। পরদিন, ১৪ অক্টোবর ২০২৫ তারিখে টঙ্গীতে অবস্থানকালে মোঃ মনিরুজ্জামান হঠাৎ অসুস্থ হয়ে মারা যান।
তার মৃত্যুর পরও ঘটনাটি নিয়ে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে পরিবারের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দেয়।
পরিবারের অভিযোগ, টঙ্গী থানার পুলিশ সদস্যরা মৃত্যুর বিষয়টি নিয়ে তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করে এবং একটি লিখিত আবেদন দিতে বাধ্য করে। ওই আবেদনে পরিবারের পক্ষ থেকে মৃত্যুর বিষয়ে কোনো অভিযোগ বা আপত্তি নেই এবং মৃত্যুটিকে স্বাভাবিক হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে বলে উল্লেখ করতে বাধ্য করা হয় বলে পরিবার দাবি করেছে।
পরিবারের একজন সদস্য বলেন, “আমরা তখন প্রচণ্ড ভয় ও মানসিক চাপে ছিলাম। এর আগে পুলিশ আমাদের বিরুদ্ধে মামলা করেছে, বাড়িতে বারবার এসেছে এবং বাবাকে হুমকি দিয়েছে। বাবার মৃত্যুর পরও পুলিশের চাপের কারণে আমরা তাদের নির্দেশের বাইরে কিছু করতে পারিনি।”
পরিবারের দাবি, মোঃ মনিরুজ্জামানের মৃত্যুর পরও পুলিশ তার দুই ছেলের বিষয়ে খোঁজখবর নেওয়া অব্যাহত রাখে। বিশেষ করে বিদেশে অবস্থানরত মোস্তাফিজুর রহমানের অবস্থান ও দেশে ফেরার সম্ভাবনা সম্পর্কে পরিবারের সদস্যদের কাছে জানতে চাওয়া হয় বলে তারা জানিয়েছেন।
পরিবারের অভিযোগের বিষয়ে পুলিশের বক্তব্য জানতে সংশ্লিষ্ট থানার কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে পুলিশ কর্মকর্তারা কোনো মন্তব্য করতে অপারগতা প্রকাশ করেন।
আইনজীবীদের মতে, কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের পর পুলিশি তদন্ত আইন অনুযায়ী পরিচালিত হতে পারে। তবে তল্লাশি, জিজ্ঞাসাবাদ, হুমকি বা কোনো পরিবারের সদস্যকে অভিযোগ প্রত্যাহার বা নির্দিষ্ট বক্তব্য দিতে বাধ্য করার অভিযোগ থাকলে সেগুলো তদন্তের আওতায় আসা উচিত।
পরিবারটি জানিয়েছে, তারা এখনো নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। তাদের দাবি, মোস্তাফিজুর রহমান বর্তমানে বিদেশে অবস্থান করলেও বাংলাদেশে তার বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার কারণে দেশে ফিরে গেলে তাকে গ্রেপ্তার ও হয়রানির মুখোমুখি হতে হতে পারে।
পরিবারের সদস্যরা আরও জানান, তারা তাদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাটি প্রত্যাহার এবং পুলিশের কথিত হয়রানি ও মোঃ মনিরুজ্জামানের মৃত্যুর পরিস্থিতি সম্পর্কে নিরপেক্ষ তদন্ত চান।