শিরোনাম :
কর্মীকে গুলি করে বিকাশ এজেন্টের ‘৩ কোটি টাকা’ ছিনতাই এলপিজি: রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ থেকে যেভাবে আমদানি ও বেসরকারি খাতনির্ভর বিরাট বাজার পঞ্চগড়ে গোপনে নারীর ভিডিও ধারণ করে ব্ল্যাকমেইল, দুই যুবক কারাগারে আশুলিয়ায় তুলার গোডাউনে আগুন, নিয়ন্ত্রণে ৪ ইউনিট তিন মাসের মধ্যে চালু হবে সিলেটের ২৫০ শয্যার সেই হাসপাতাল সাত মাসে ১৫ হাজার ৭১৭ শিশু নিখোঁজ, খোঁজ মেলেনি ২ হাজার ৩৮ জনের: পুলিশ সাত দিনের মধ্যে ওসমানী হাসপাতালের সব সমস্যার সমাধান হবে: স্বাস্থ্যমন্ত্রী মুন্নির মৃত্যুর রহস্যে নতুন তথ্য, যা আছে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে ‘প্রথমবার চালু হয়েছে মহিলা বাস, সিলেটের মেয়ে হয়ে এর অংশ হতে পেরে গর্বিত’ গোয়াইনঘাটে মেছোবিড়াল পিটিয়ে হত্যা, ভিডিও ছড়ানো হলো ফেসবুকে
শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৩৮ পূর্বাহ্ন

এলপিজি: রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ থেকে যেভাবে আমদানি ও বেসরকারি খাতনির্ভর বিরাট বাজার

ডেস্ক রিপোর্ট / ২ বার দেখা হয়েছে
প্রকাশিত : শুক্রবার, ৯ অক্টোবর, ২০২৬

বাংলাদেশে রান্নার জ্বালানি হিসেবে পরিচিত এলপিজি বা লিকুইফায়েড পেট্রোলিয়াম গ্যাস। পাইপলাইন গ্যাস সুবিধার বাইরে থাকা দেশের বিপুলসংখ্যক পরিবার এখন এলপিজির ওপর নির্ভরশীল। রেস্তোরাঁ, শিল্পকারখানায় এবং অটোগ্যাস হিসেবেও এর ব্যবহার আছে।

চাহিদার প্রায় ৯৯ শতাংশ এলপিজি বেসরকারিভাবে আমদানি করা হয়। তবে এর বাজারের শুরুটা হয়েছিল প্রায় পাঁচ দশক আগে, রাষ্ট্রীয় একটি প্রকল্পের মধ্য দিয়ে–খুব ছোট পরিসরে। তা এখন বছরে প্রায় ১৭ লাখ টনের বাজারে পরিণত হয়েছে।

শুরুর গল্প

বাংলাদেশে এলপিজির বাণিজ্যিক যাত্রা শুরু হয় রাষ্ট্রায়ত্ত বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) উদ্যোগে। চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় ইস্টার্ন রিফাইনারিতে অপরিশোধিত তেল প্রক্রিয়াকরণের সময় উপজাত হিসেবে যে এলপিজি পাওয়া যেত, তা বোতলজাত করে বাজারজাতের জন্য ১৯৭৭-৭৮ সালে একটি প্ল্যান্ট নির্মাণ করা হয়। প্রকল্পটি ১৯৭৮ সালের আগস্টে শেষ হয় এবং ওই বছরের সেপ্টেম্বর থেকেই শুরু হয় বাণিজ্যিক উৎপাদন।

পরে সিলেটের কৈলাশটিলা গ্যাসক্ষেত্র থেকে পাওয়া ন্যাচারাল গ্যাস লিকুইড বা এনজিএল প্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমে এলপিজি উৎপাদনে আরেকটি সরকারি প্ল্যান্ট করা হয়। সেটি ১৯৯৮ সালের সেপ্টেম্বরে উৎপাদনে যায়।

বর্তমানের বিশাল এলপিজি বাজার তৈরি হয়েছে মূলত বেসরকারি খাতের হাত ধরে। ১৯৯৯ সালে বসুন্ধরা এলপি গ্যাস আমদানি, বোতলজাত ও বিপণন শুরু করে। প্রতিষ্ঠানটি প্রথম বেসরকারি এলপিজি আমদানিকারক ও বিপণনকারী হিসেবে কার্যক্রম শুরু করেছিল।

এখন বছরে আনুমানিক ১৭ লাখ টন এলপিজি ব্যবহার হচ্ছে। মাসে গড়ে চাহিদা প্রায় ১ লাখ ৪২ হাজার থেকে দেড় লাখ টন। সংশ্লিষ্টদের হিসাবে, এর প্রায় ৮০ শতাংশই যায় বাসাবাড়ির রান্নায়।

কারা এলপিজি আমদানি করে

২০২৪-২৫ অর্থবছরে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো প্রায় ১৭ লাখ ৫৪ হাজার টন এলপিজি আমদানি করেছে। একই সময়ে সরকারি খাত থেকে সরবরাহ ছিল ১৯ হাজার ৪৭৯ টন।

দেশে ৫২টি প্রতিষ্ঠানের এলপিজি ব্যবসার লাইসেন্স রয়েছে। লাইসেন্স থাকলেই অবশ্য সবাই আমদানি করে না। ১৫টির মতো প্রতিষ্ঠান নিয়মিত এলপিজি আমদানি করে থাকে।

বড় আমদানিকারকদের মধ্যে আছে ফ্রেশ এলপিজি, ইউনাইটেড আয়গ্যাজ, যমুনা স্পেসটেক, ওমেরা, বিএম এনার্জি, পেট্রোম্যাক্স, লাফস গ্যাস বাংলাদেশ, প্রিমিয়ার এলপি গ্যাস, ডেল্টা এলপিজি, এসকেএস এলপিজি।

এ বছরের শুরুতে সরকার এলপিজি আমদানির উদ্যোগ নিলেও তা এখনও বাস্তবায়ন করতে পারেনি।

কেন এলপিজির প্রয়োজন বাড়ল

দীর্ঘদিন ধরে আবাসিকে পাইপলাইনে গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। কিন্তু নিজস্ব গ্যাস উৎপাদন চাহিদার সঙ্গে তাল মেলাতে না পারায় ২০১০ সালে নতুন সংযোগ দেওয়া বন্ধ করে সরকার। সরকার তখন বিকল্প রান্নার জ্বালানি হিসেবে এলপিজির ব্যবহার বাড়ানোর ওপর জোর দিতে শুরু করে।

এলপিজি শুধু পাইপলাইন গ্যাস না থাকা এলাকার জ্বালানি হিসেবে নয়; ধীরে ধীরে জাতীয় জ্বালানি ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত হয়। এলপিজির বাজারও বাড়তে থাকে।

বাজার সম্প্রসারণের সঙ্গে সরকার নীতিমালা তৈরি করে। ২০১৬ সালে এলপিজি বোতলজাতকরণ প্ল্যান্ট স্থাপনসংক্রান্ত এবং ২০১৭ সালে এলপিজি অপারেশনাল লাইসেন্সিং নীতিমালা করা হয়। এখন এলপিজি প্ল্যান্ট স্থাপন, আমদানি, মজুত ও বোতলজাতকরণে সরকারের অনুমোদন এবং সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা ও কারিগরি ছাড়পত্র প্রয়োজন হয়।

কীভাবে আসে এলপিজি

বাংলাদেশে ব্যবহৃত এলপিজির বড় অংশ আসে যুক্তরাষ্ট্র ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে। অনেক সময় সরাসরি উৎপাদক দেশ ছাড়াও সিঙ্গাপুর বা সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক ট্রেডারের মাধ্যমে কেনা হয়।

এলপিজি মূলত প্রোপেন ও বিউটেনের মিশ্রণ। চাপ প্রয়োগ করে গ্যাসটিকে তরল অবস্থায় রাখা হয়। কারণ তরল অবস্থায় কম জায়গায় বেশি পরিমাণ এলপিজি পরিবহন ও সংরক্ষণ করা যায়।

বিদেশ থেকে প্রেসারাইজড বা রেফ্রিজারেটেড জাহাজে এলপিজি আসে। আমদানির প্রধান প্রবেশপথ চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর এবং সীতাকুণ্ড এলাকার বিভিন্ন বেসরকারি জেটি।

বড় জাহাজ সব টার্মিনালে সরাসরি ভিড়তে পারে না। অনেক ক্ষেত্রে গভীর সমুদ্রে বড় জাহাজ থেকে ছোট জাহাজ বা লাইটার ভেসেলে এলপিজি স্থানান্তর করা হয়। এরপর ছোট জাহাজ সংশ্লিষ্ট কোম্পানির টার্মিনালে গিয়ে এলপিজি খালাস করে। বড় জাহাজ সরাসরি ভেড়ানোর মতো সুযোগ না থাকায় বাংলাদেশের পরিবহন ব্যয় তুলনামূলক বেশি।

টার্মিনালের বড় প্রেসারাইজড ট্যাংকে এলপিজি সংরক্ষণ করা হয়। সেখান থেকে বোতলজাতকরণ প্ল্যান্টে ১২ কেজিসহ বিভিন্ন আকারের সিলিন্ডারে ভরা হয়। পরে ট্রাকের মাধ্যমে ডিস্ট্রিবিউটর, ডিলার ও খুচরা বিক্রেতার কাছে যায়। শেষ পর্যন্ত গ্রাহকের হাতে পৌঁছায়।

শিল্পকারখানা বা বড় বাণিজ্যিক গ্রাহকদের ক্ষেত্রে সিলিন্ডারের বদলে বাল্ক ট্যাংকারে সরাসরি এলপিজি সরবরাহ করা হয়। একইভাবে অটোগ্যাস স্টেশনেও বাল্ক আকারে সরবরাহ হয়।

এলপিজির ব্যবস্থাপনা কীভাবে

বেসরকারি এলপিজির খুচরা মূল্য নির্ধারণ করে বিইআরসি। দীর্ঘ সময় বেসরকারি কোম্পানিগুলো নিজেরাই মূল্য নির্ধারণ করত। একটি রিট আবেদনের পর ২০২০ সালের ২৫ আগস্ট হাইকোর্ট বিইআরসিকে এলপিজির মূল্য নির্ধারণের নির্দেশ দেন। এরপর গণশুনানি শেষে ২০২১ সালের ১২ এপ্রিল কমিশন প্রথমবারের মতো বেসরকারি এলপিজির মূল্য নির্ধারণ করে। এর পর থেকে প্রতি মাসে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দাম সমন্বয় করা হচ্ছে।

সরকারি নির্ধারিত দামে বাজারে এলপিজি না পাওয়ার অভিযোগ অবশ্য দীর্ঘদিনের। মাঝেমধ্যে ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান পরিচালনা করে।

চলতি মাসের জন্য ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৮৩৭ টাকা। আগের মাসের তুলনায় এক সিলিন্ডারে দাম বেড়েছে ২৫২ টাকা। ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় ১২ কেজি সিলিন্ডার ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৬০০ টাকায় পর্যন্ত বিক্রির অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, তারা সেপ্টেম্বরের শেষ দিক থেকে প্রয়োজনমতো সরবরাহ পাচ্ছেন না।

আমদানির পরিসংখ্যান অবশ্য সরবরাহ ঘাটতির কথা বলছে না। এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (লোয়াব) হিসাবে, আগস্টে প্রায় ১ লাখ ৫৮ হাজার টন এবং সেপ্টেম্বরে প্রায় ১ লাখ ৫৬ হাজার টন এলপিজি আমদানি হয়।

এলপিজিতে ট্যাক্স কত, সংকট কোথায়

২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এলপিজির কর কাঠামোয় পরিবর্তন আনে। স্থানীয় উৎপাদন ও ব্যবসায়ী পর্যায়ে থাকা ৭.৫ শতাংশ ভ্যাট এবং আমদানি পর্যায়ের ২ শতাংশ আগাম কর প্রত্যাহার করে শুধু আমদানি পর্যায়ে ৭.৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপের ব্যবস্থা করা হয়।

ফেব্রুয়ারির শেষে মধ্যপ্রাচ্যে শুরু হওয়া সংঘাত বৈশ্বিক জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় বিরূপ প্রভাব ফেলেছে। বাদ যায়নি জ্বালানি আমদানিকারক বাংলাদেশও। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান অস্থিরতার কারণে এখনও একাধিক আন্তর্জাতিক নৌপথে ঝুঁকি রয়েছে। এ কারণে জাহাজভাড়া ও বিমা ব্যয় বেড়েছে। সে কারণেই মূলত অক্টোবরে এলপিজির দাম কেজিতে ২১ টাকা করে বেড়েছে; যদিও নির্ধারিত নতুন দামেও এটি পাওয়া যাচ্ছে না বলে অভিযোগ।


আরো সংবাদ পড়ুন...