দেশের বিভিন্ন স্থানে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ওপর বাংলাদেশ ছাত্রলীগ (বিসিএল) কর্মীদের হামলা, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও নির্যাতনের একাধিক অভিযোগ সামনে আসায় নতুন করে উদ্বেগ ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। রাজনৈতিক মতপার্থক্য ও ছাত্ররা জনীতিতে যুক্ত হতে অস্বীকৃতি জানানোর জেরে এসব হামলার ঘটনা ঘটছে বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের।
স্থানীয় সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, যে সব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে আগে সক্রিয় ছাত্র রাজনীতি ছিলনা, সেসব প্রতিষ্ঠানেও জোরপূর্বক রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা চলছে। এর প্রতিবাদ করলেই শিক্ষার্থীদের হুমকি দেওয়া হচ্ছে এবং কোথাও কোথাও শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা হচ্ছে।
এ ধরনের ঘটনার মধ্যে ১৭ ডিসেম্বর সিলেটের লিডিং ইউনিভার্সিটিতে সংঘটিত একটি গুরুতর ঘটনা বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে। প্রত্যক্ষদর্শী ও ভুক্তভোগীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই দিন ছাত্ররাজনীতিতে যুক্ত হতে অস্বীকৃতি জানানোর কারণে কয়েকজন শিক্ষার্থীকে ছাত্রলীগের কর্মীরা ঘিরে ধরে গালাগালি করে এবং শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করে।
আহত শিক্ষার্থীদের মধ্যে রয়েছেন মোঃ মাকসুর আবেদীন খান শিহাব, রিঙ্কো তালুকদার, রওনক হাসান ও খালিদ লিটনসহ আরও কয়েকজন। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, তাদের অনেককে একত্রে ঘিরে ভয়ভীতি দেখানো হয় এবং মারধরের শিকার হতে হয়।
ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীরা জানান, সরকারের দলীয় সমর্থিত ছাত্রসংগঠনের বিরুদ্ধে কথা বললে বা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হতে অস্বীকৃতি জানালে ‘গুরুতর পরিণতি’র হুমকিও দেওয়া হয়েছে।
এই ঘটনার পর শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে ব্যাপক আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। অনেক অভিভাবক আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছেন, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তিপূর্ণ শিক্ষার পরিবেশ এখন মারাত্মক ঝুঁকির মুখে।
লিডিং ইউনিভার্সিটির এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক নাম
প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “আমরা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে নিরাপদ মনে করতাম। এখন আমাদের সন্তানরা চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে।”
একজন আহত শিক্ষার্থী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “আমরা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে এসেছি শান্তিপূর্ণভাবে লেখাপড়া করার জন্য, রাজনীতিতে জড়াতে নয়। তারা স্পষ্টভাবে বলেছে—বিরোধিতা করলে ভয়াবহ পরিণতি ভোগ করতে হবে।”
উদ্বেগ প্রকাশ শিক্ষাবিদ ও মানবাধিকারকর্মীদের
শিক্ষাবিদ ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরাও বিষয়টি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
ঢাকার শিক্ষাবিশ্লেষক অধ্যাপক ড. আনোয়ার হোসেন বলেন, “রাজনৈতিক সহিংসতা যদি এভাবে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে অচিরেই সেগুলোও সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো অস্থিরতা ও অনিরাপত্তার মুখে পড়বে।”
মানবাধিকারকর্মীরা এসব হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অবিলম্বে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। মানবাধিকার
আইনজীবী অ্যাডভোকেট শারমিন আক্তার বলেন,
“রাজনৈতিক মত বা সংগঠনে যুক্ত হতে অস্বীকৃতি জানানোর কারণে কোনো শিক্ষার্থীকে হামলা বা হুমকির শিকার হতে দেওয়া যায় না। ক্যাম্পাসকে ভয় ও সহিংসতামুক্ত রাখতে হবে।”
পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠায় শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে সুরক্ষা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন, এবং বলেছেন—শিক্ষা প্রতিষ্ঠান যেন শিক্ষা কেন্দ্রই থাকে, রাজনৈতিক আতঙ্কের জায়গা না হয়।