শনিবার, ০৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০৪:১৪ পূর্বাহ্ন

সুনামগঞ্জ-২: ভোটের মাঠে এখনও প্রাসঙ্গিক সুরঞ্জিত

অনলাইন ডেস্ক / ০ বার দেখা হয়েছে
প্রকাশিত : শুক্রবার, ৬ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬

এবার নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেই। গত বছর থেকে কার্যক্রম নিষিদ্ধ দলটির। তার আগে থেকেই নেই সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। ২০১৭ সালে প্রয়াত হয়েছেন তিনি। তবে মৃত্যুর নয় বছর পরও নিজ এলাকায় ভোটের মাঠে এখনও প্রাসঙ্গিক সুরঞ্জিত, যিনি ‘ভাটি বাংলার নেতা’ হিসেবে পরিচিত।

তাই সুনামগঞ্জ-২ (দিরাই-শাল্লা) আসনের বিএনপি জামায়াতের প্রার্থীদের বারবার নিতে হচ্ছে প্রয়াত আওয়ামী লীগ নেতা ও সাবেক মন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের নাম।

সুনামগঞ্জ-২ আসন সুরঞ্জিতের আসন হিসেবেই পরিচিত। এই আসনে ১৯৭০ সালে (তৎকালীন পাকিস্তান নির্বাচনে) তখনকার সিলেট-২ আসন থেকে প্রথম ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির (ন্যাপ) প্রার্থী হিসেবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। ১৯৯৬ সালে দল বদল করে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়ে জাতীয় পার্টির নাছির উদ্দিন চৌধুরীর কাছে সামান্য ভোটে হেরে যান সুরঞ্জিত। এরপর থেকে এ আসনে তিনি আর হারেননি। সাতবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন।

সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে দায়িত্ব পালন করেছেন সরকারের রেলমন্ত্রী এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সংসদবিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে। স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়ন কমিটির কনিষ্ঠ সদস্য ও সংসদ বিশেষজ্ঞ হিসেবে তার পরিচিতি ছিল দেশে-বিদেশে।

সুরঞ্জিতের মৃত্যুর পর সুনামগঞ্জ-২ আসন থেকে তার স্ত্রী ড. জয়া সেনগুপ্তা উপনির্বাচনসহ তিনবার (একবার স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে) এই আসনে এমপি হন। এবারের জাতীয় নির্বাচনে সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের পরিবারের কেউ প্রার্থী নেই। আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীকও নেই। প্রার্থীরা তাই ছুটছেন সুরঞ্জিত পরিবার ও আওয়ামী লীগের ভোট নিজের পক্ষে আনতে। রীতিমতো কাড়াকাড়ি এই ভোট নিয়ে।

ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে এই আসনে বিএনপির প্রার্থী মো. নাছির চৌধুরী এই আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য। জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১–দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের প্রার্থী মোহাম্মদ শিশির মনির সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি। এই দুজন ছাড়া এখানে আরেকজন প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আছেন। তিনি হলেন কমিউনিস্ট পার্টির প্রার্থী আইনজীবী নিরঞ্জন দাস খোকন। তারা সকলই সুরঞ্জিত সেন বলয়ের ভোট নিজেদের পক্ষে টানার চেষ্টা করছেন।

গত বৃহস্পতিবার ছিলো সুরঞ্জিত সেনের নবম মৃত্যুবার্ষিকী। মৃত্যুবার্ষিকীতে প্রয়াত এই নেতাকে শ্রদ্ধায় স্মরণ করেছেন মো. নাছির চৌধুরী ও মোহাম্মদ শিশির মনির। এই দুই প্রার্থী ফেসবুক পেজে দেওয়া পোস্টের মাধ্যমে সুরঞ্জিত সেনগুপ্তকে স্মরণ করেন।

শুধু মৃত্যুবার্ষিকীতে নয়, এই দুই প্রার্থী তাঁদের নির্বাচনী সভা-সমাবেশেও সুরঞ্জিত সেনগুপ্তকে নানাভাবে আলোচনায় নিয়ে আসছেন, তাকে স্মরণ করছেন। দিরাই-শাল্লার সম্প্রীতির রাজনীতিতে সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের অবদানের কথা তুলে ধরে নিজেরাও সেটি বজায় রাখার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন।

শিশির মনিরের কার্যক্রমের প্রচার মাধ্যম ‘শিশির মনির মিডিয়া সেল’ থেকে বৃহস্পতিবার দেওয়া ফেসবুক পোস্টে লেখা হয়, ‘দিরাই শাল্লা থেকে বারবার নির্বাচিত সংসদ সদস্য বিশিষ্ট পার্লামেন্টারিয়ান বীর মুক্তিযোদ্ধা বাবু সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের নবম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। আজকের এই দিনে তাঁকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি। তাঁর আত্মার শান্তি কামনা করছি।’

এদিকে ফেসবুক পেজে সুরঞ্জিত সেনগুপ্তকে নিয়ে পোস্ট দেন মো. নাছির চৌধুরী। সুরঞ্জিত সেনগুপ্তকে মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠন ও বিশিষ্ট পার্লামেন্টারিয়ান উল্লেখ করে তাঁকে শ্রদ্ধায় স্মরণ ও তাঁর আত্মার শান্তি কামনা করেন নাছির চৌধুরী। এই আসনে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সুরিঞ্জত সেনগুপ্তের সঙ্গে একাধিকবার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন নাছির চৌধুরী।

মঙ্গলবার বিকেলে নির্বাচনী এলাকার হবিবপুর ইউনিয়নের শ্বাশখাই বাজারে সমাবেশ করেন বিএনপি মনোনীত প্রার্থী নাছির উদ্দিন চৌধুরী। বুধবার বিকেলে একই স্থানে সমাবেশ করেন জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থী শিশির মনির। দুইজনের সমাবেশেই সুরঞ্জিত সেনের অনুসারী বিপুল সংখ্যক আওয়ামী লীগ সমর্থক ও ভোটাররা উপস্থিত ছিলেন।

জামায়াত প্রার্থীর সমাবেশে রবীন্দ্র দাসের সভাপতিত্বে সমাবেশে শিশির মনির ছাড়াও বক্তব্য দেন বাবলু দাস, সাবেক ইউপি সদস্য রথীন্দ্র দাস, মন্টু দাস, সাবেক ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান বিধান চন্দ্র চৌধুরী, নোমান আহমদ প্রমুখ।

আগের দিন মঙ্গলবার একই স্থানে সমাবেশ করেন বিএনপি মনোনীত প্রার্থী নাছির উদ্দিন চৌধুরী। মুক্তিযোদ্ধা অর্জুন দাসের সভাপতিত্বে সমাবেশে বক্তব্য দেন অ্যাডভোকেট তাহির রায়হান চৌধুরী পাভেল, সচীপদ দাস, সঞ্জিত দাস, শৈলেন্দু দাস, শৈলেন দাস প্রমুখ।

শিশির মনিরের সমর্থক হিসেবে পরিচিত হিমেল দাস বললেন, ‘আমি ব্যবসায়ী মানুষ, এখানে যারা মামলা গ্রেপ্তারের আতঙ্কে ছিলেন, তাদের আইনি সহযোগিতাসহ নানাভাবে সহযোগিতা দিয়েছেন শিশির মনির। ব্যক্তিগত পক্ষ থেকে এলাকায় কিছু উন্নয়নও করেছেন।

নাছির উদ্দিন চৌধুরীর সমর্থক জাতীয়তাবাদী মৎস্যজীবী দলের শাল্লা উপজেলা শাখার সাবেক সভাপতি সচীপদ দাস বললেন, দিরাই-শাল্লায় মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে-বিপক্ষের অস্তিত্বের লড়াই। বীর মুক্তিযোদ্ধা নাছির উদ্দিন চৌধুরীকে দিরাই-শাল্লার সবাই ভালোবাসেন। গেল নির্বাচনগুলোয় সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, কিংবা তাঁর স্ত্রী প্রার্থী থাকায় অনেকে নাছির উদ্দিন চৌধুরীকে ভোট দিতে পারেননি। এবার সুযোগ পেয়েছেন। মামলায় যারা জড়িত রয়েছেন, তারা ছাড়া সকলেই নাছির উদ্দিন চৌধুরীর পক্ষে বলে দাবি করেন তিনি।

এ ব্যাপারে সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের স্ত্রী ও এই আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ড. জয়া সেনগুপ্তা বললেন, ‘ভালো লাগার বিষয় হচ্ছে প্রার্থীরা সবাই সুরঞ্জিত সেনগুপ্তকে প্রচারণায় সামনে আনছেন। তবে আমাদের নেত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশ ভোট বর্জনের। আমরা ভোট বর্জনেই আছি।’

সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত ১৯৪৫ সালের ৫ মে দিরাই উপজেলার আনোয়ারপুর গ্রামে জন্ম নেন। তাঁর মৃত্যু হয় ২০১৭ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি।


আরো সংবাদ পড়ুন...