বৃহস্পতিবার, ০৬ অগাস্ট ২০২৬, ০৭:০৪ পূর্বাহ্ন

১৪ বছরের নির্যাতন, মাদক, হুমকি ও দেশান্তর: নিরাপত্তার খোঁজে এক বাংলাদেশি মা ও তাঁর সন্তানের দীর্ঘ লড়াই

নিজস্ব প্রতিবেদক | নয়াবাজার, ঢাকা: / ১০ বার দেখা হয়েছে
প্রকাশিত : রবিবার, ৯ এপ্রিল, ২০২৩

প্রায় ১৪ বছর ধরে পারিবারিক সহিংসতা, যৌতুকের চাপ, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, প্রাণনাশের হুমকি এবং প্রভাবশালী মহলের হয়রানির শিকার হওয়ার অভিযোগ তুলেছেন নয়াবাজার, ঢাকার এক নারী, সানজিদা আক্তার মুনিয়া। তাঁর দাবি, নিজের এবং একমাত্র সন্তানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তিনি একাধিক দেশ পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়েছেন। বর্তমানে তিনি ও তাঁর সন্তান একটি নিরাপদ ও স্থায়ী আশ্রয়ের সন্ধানে রয়েছেন।

পরিবারের সদস্য, আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী এবং প্রতিবেদকের কাছে থাকা বিভিন্ন নথিপত্র পর্যালোচনা করে জানা যায়, অভিযোগগুলোর বেশ কয়েকটি বিষয়ে অতীতে থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি), লিখিত অভিযোগ এবং অন্যান্য আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছিল। যদিও উত্থাপিত সব অভিযোগ স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি, তবে বিভিন্ন ব্যক্তি ও নথিপত্রে দীর্ঘদিনের পারিবারিক বিরোধ এবং নির্যাতনের অভিযোগের উল্লেখ পাওয়া গেছে।
সানজিদার দাবি, ২০০৯ সালে মো. আরমান আহমেদের সঙ্গে তাঁর বিয়ের কিছুদিন পর থেকেই দাম্পত্য জীবনে অশান্তি শুরু হয়। তাঁর অভিযোগ, শ্বশুরবাড়ির পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে অর্থ, সম্পদ এবং তাঁর বাবার পারিবারিক ব্যবসার ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হয়।

তিনি বলেন, “আমি সংসার টিকিয়ে রাখতে এবং সন্তানকে একটি স্বাভাবিক পরিবার দিতে অসংখ্যবার আপস করার চেষ্টা করেছি। আমার পরিবার তাদের অনেক দাবিই পূরণ করেছে। এমনকি আমার নামে সম্পত্তি হস্তান্তর পর্যন্ত করা হয়েছিল। কিন্তু কোনো কিছুই পরিস্থিতির উন্নতি ঘটাতে পারেনি। বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের মাত্রা আরও বেড়েছে। আমি দীর্ঘদিন ধরে ভয়, অনিশ্চয়তা এবং নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে দিন কাটিয়েছি।”
তিনি আরও অভিযোগ করেন, উচ্চশিক্ষা গ্রহণের চেষ্টা করলেও তাঁর স্বামী বিভিন্নভাবে বাধা সৃষ্টি করতেন। পরীক্ষার আগে ইচ্ছাকৃতভাবে পারিবারিক অশান্তি সৃষ্টি, অপমান, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং মানসিক চাপ প্রয়োগের কারণে তাঁর শিক্ষাজীবন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

সানজিদার এক নিকট আত্মীয় বলেন, “সে নিজের পায়ে দাঁড়াতে চেয়েছিল, নিজের একটি পরিচয় গড়ে তুলতে চেয়েছিল। কিন্তু আমরা দেখেছি, যখনই সে পড়াশোনা বা ক্যারিয়ার নিয়ে এগোতে চেষ্টা করেছে, তখনই তার ওপর নানা ধরনের চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে। তার আত্মবিশ্বাস ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে, যাতে সে সব সময় অন্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে থাকে।”

পরিবারের দাবি, ২০১৯ সালে স্বামীর পরকীয়ার বিষয়টি জানতে পারার পর সানজিদা মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। একই সময়ে তাঁর স্বামীর মাদকাসক্তির বিষয়টিও পরিবারের কাছে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। পরিবারের সদস্যরা জানান, পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় তাঁরা তাঁকে একটি পুনর্বাসন কেন্দ্রে ভর্তি করানোর উদ্যোগ নেন। তবে চিকিৎসা সম্পন্ন হওয়ার আগেই পরিবারের অন্য সদস্যরা তাঁকে সেখান থেকে নিয়ে আসেন। এ বিষয়ে সানজিদা বলেন, “মাদকাসক্তির কারণে তাঁর আচরণ দিন দিন আরও আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে। তিনি সংসার, সন্তান কিংবা পারিবারিক দায়িত্বের প্রতি উদাসীন হয়ে পড়েন। ছোট ছোট বিষয় নিয়েও উত্তেজিত হয়ে যেতেন, আর সেই পরিস্থিতির শিকার হতে হতো আমাকে এবং আমার সন্তানকে।”

সন্তানের শিক্ষাজীবনও এ পারিবারিক অস্থিরতার প্রভাব থেকে মুক্ত ছিল না বলে অভিযোগ উঠেছে। সানজিদার ভাই বলেন, “আমার ভাগ্নের স্কুলের ফি নিয়মিত পরিশোধ করা হয়নি, ফলে তার পড়াশোনা বন্ধ হওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। একজন শিশুর ভবিষ্যৎ এভাবে অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে যেতে পারে, সেটা আমরা মেনে নিতে পারিনি। তাই আমি নিজেই তার টিউশন ফি ও অন্যান্য শিক্ষাব্যয় বহন করি। আমার বোনের পাশে দাঁড়ানোর কারণেই আমাকেও বিভিন্ন ধরনের হুমকি, ভয়ভীতি এবং শারীরিক হামলার মুখোমুখি হতে হয়েছে।”

স্বামীর বাড়ির এক সাবেক গৃহকর্মী দাবি করেন, তিনি দীর্ঘ সময় ধরে পরিবারের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি কাছ থেকে দেখেছেন। তাঁর ভাষায়, “আমি অনেকবার আপাকে কান্না করতে দেখেছি। কয়েকবার তাঁকে ধাক্কা দিতে, চিৎকার করতে এবং মারধর করতেও দেখেছি। অনেক সময় তিনি তাঁর সন্তানকে নিয়ে ঘরের দরজা বন্ধ করে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ভেতরে থাকতেন। আমি একজন বাইরের মানুষ হয়েও বুঝতে পারতাম, তিনি সব সময় ভয়ের মধ্যে জীবন কাটাচ্ছিলেন।”

বাবার বাড়ির এক প্রতিবেশী বলেন, “আমরা বহুবার তাঁদের বাড়িতে চিৎকার-চেঁচামেচি এবং হট্টগোলের শব্দ শুনেছি। কয়েকবার সানজিদাকে আহত এবং মানসিকভাবে বিপর্যস্ত অবস্থায় বাড়িতে ফিরে আসতে দেখেছি। একজন নারী বছরের পর বছর এমন পরিস্থিতির মধ্যে কীভাবে বেঁচে থাকতে পারেন, তা কল্পনা করাও কঠিন।”
নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্বামীর বাড়ির এক প্রতিবেশী বলেন, “ওই পরিবারের সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রভাব রয়েছে বলে এলাকায় অনেকেই খোলাখুলি কথা বলতে চান না। সবাই সবকিছু জানলেও প্রকাশ্যে কিছু বললে নানা ধরনের সমস্যার আশঙ্কা থাকে। তাই অনেকে নীরব থাকাকেই নিরাপদ মনে করেন।”

নারী অধিকারকর্মীদের মতে, যৌতুকের দাবি, দীর্ঘমেয়াদি মানসিক নির্যাতন, জোরপূর্বক নিয়ন্ত্রণ এবং সন্তানের নিরাপত্তাকে কেন্দ্র করে ভয়ভীতি প্রদর্শন—এসবই পারিবারিক সহিংসতার গুরুতর রূপ। এক নারী অধিকারকর্মী বলেন, “অনেক ক্ষেত্রে শারীরিক নির্যাতনের চেয়েও মানসিক নিয়ন্ত্রণ ও ভয়ভীতি প্রদর্শন একজন নারীকে দীর্ঘমেয়াদে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করে। এসব অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক এবং ভুক্তভোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্ব।”

একজন সমাজকর্মী বলেন, “বাংলাদেশে অসংখ্য নারী সামাজিক সম্মান, সন্তানের ভবিষ্যৎ এবং পারিবারিক চাপের কারণে বছরের পর বছর নির্যাতন সহ্য করেন। অনেকেই শেষ পর্যন্ত নিরাপত্তাহীনতার কারণে নিজ বাড়ি কিংবা দেশ ছেড়ে যেতে বাধ্য হন। এ ধরনের অভিযোগগুলো কেবল একটি পরিবারের সংকট নয়; এটি একটি বৃহত্তর সামাজিক বাস্তবতার প্রতিফলন।”

স্থানীয় থানার এক কর্মকর্তা বলেন, “ভুক্তভোগী পক্ষের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে অভিযোগ ও আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার তথ্য রয়েছে। যেসব অভিযোগের লিখিত নথি রয়েছে, সেগুলো আইন অনুযায়ী প্রক্রিয়াধীন ছিল অথবা তদন্ত করা হয়েছে। তবে নির্দিষ্ট অভিযোগের বিষয়ে বিস্তারিত মন্তব্য করা এই মুহূর্তে সম্ভব নয়।”

প্রতিবেদকের কাছে থাকা নথিপত্রের মধ্যে রয়েছে সাধারণ ডায়েরির কপি, অভিযোগপত্র, চিকিৎসা সংক্রান্ত কাগজপত্র, পুনর্বাসন কেন্দ্রের নথি এবং আত্মীয়-স্বজন ও সাক্ষীদের লিখিত বিবৃতি। তবে এসব অভিযোগের সবগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি এবং অভিযুক্ত পক্ষের বক্তব্যও পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে মো. আরমান আহমেদের সঙ্গে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। ফলে তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের বিষয়ে কোনো বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।
দীর্ঘ এই সংকটময় জীবনের শেষে সানজিদার চাওয়া খুবই সাধারণ।

তিনি বলেন, “আমি কোনো প্রতিশোধ চাই না, কারও ক্ষতিও চাই না। আমি শুধু চাই আমার ছেলে নিরাপদে বড় হয়ে উঠুক, নিয়মিত স্কুলে যেতে পারুক এবং ভয় ও অনিশ্চয়তা ছাড়া একটি স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারুক। একজন মা হিসেবে আমার সবচেয়ে বড় স্বপ্ন হলো, আমার সন্তান যেন এমন একটি পরিবেশে বেড়ে ওঠে যেখানে তাকে প্রতিদিন নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তা করতে না হয়।”


আরো সংবাদ পড়ুন...