শনিবার, ১৭ জানুয়ারী ২০২৬, ০৩:৫৯ পূর্বাহ্ন

এক শৃঙ্খল থেকে আরেক শৃঙ্খলে: বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রতিশোধের দুষ্টচক্র

লেখক: ওসমান গনি: / ৯৪ বার দেখা হয়েছে
প্রকাশিত : শুক্রবার, ১০ জানুয়ারী, ২০২৫

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার সরকার পতনের পর, বাংলাদেশের বহু নাগরিক আশা করেছিলেন যে এটি হবে রাজনৈতিক ভয়ভীতি, নির্বিচার গ্রেফতার ও দলীয় সহিংসতার এক যুগের অবসান। বহু বছর ধরে আগের সরকার বিরোধী মতকে দমন এবং রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে ভিন্নমতকে স্তব্ধ করার অভিযোগের মুখে ছিল। কিন্তু যারা একসময় অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলেছিলেন, তাদের অনেকের কাছে পরিবর্তনের এই সময়টি মুক্তির পরিবর্তে নতুন এক আতঙ্কের সূচনা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সরকার পরিবর্তনের পরবর্তী কয়েক মাসে দেশে দেখা দিয়েছে রাজনৈতিক প্রতিশোধ ও শোষণের এক নতুন ধারা – কেবল নতুন রূপে, নতুন হাতে। বিএনপি-ঘেঁষা গোষ্ঠী, বিভিন্ন ইসলামপন্থী দল এবং এমনকি সাবেক শাসক দলের কিছু প্রভাবশালী অংশকেও এখন অভিযুক্ত করা হচ্ছে একই ভয় ও নিপীড়নের অস্ত্র ব্যবহার করার জন্য। যারা একসময় আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক নিপীড়নের শিকার ছিলেন, তারাই এখন নতুন ক্ষমতাধরদের হাতে হয়রানি ও নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন।

স্থানীয় পর্যবেক্ষক ও সাধারণ নাগরিকদের ভাষায়, দেশে এক ধরনের “নির্যাতনের সংস্কৃতি”গড়ে উঠেছে যা সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে হাতবদল হয়, কিন্তু কখনোই বিলুপ্ত হয় না। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, ভুয়া মামলা ও মিথ্যা অভিযোগ এখন নতুন রাজনৈতিক প্রতিশোধ ও আর্থিক চাঁদাবাজির হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। এর নীতিটা নির্মমভাবে সহজ-একটি মিথ্যা মামলা মানেই টাকা আদায়ের সুযোগ। নিরপরাধ মানুষ নিজেদের নিরাপদ রাখার জন্য অর্থ দিতে বাধ্য হচ্ছে, আর যারা এই মিথ্যা মামলা সাজাচ্ছে তারা পাচ্ছে প্রভাব ও আর্থিক লাভ দুই-ই।

আজ যারা নির্যাতনের শিকার, তাদের অনেকেই একসময় আওয়ামী লীগের প্রতি আস্থাশীল ছিলেন-বিশ্বাস করেছিলেন, দলটি সংস্কার ও জবাবদিহিতা আনবে। কিন্তু সেই আশা ভঙ্গের পর তারা যখন আওয়ামী লীগের দুর্নীতির সমালোচক হন, এখন নতুন ক্ষমতাসীনরা সেই অতীত সমর্থনকেই “গোপন আওয়ামীপন্থা”হিসেবে উপস্থাপন করছে। এই বিকৃত যুক্তি তাদের হয়রানি ও সামাজিকভাবে একঘরে করার সুবিধাজনক অজুহাত হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

এই চিত্র এক গভীর ব্যঙ্গ-যারা একসময় অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন, তারাই আজ আবার অন্যায়ের শিকার। পরিবর্তনের নামে বাংলাদেশের রাজনীতিতে শুরু হয়েছে আরেক অধ্যায়, যেখানে ন্যায়বিচার নয়, রাজনৈতিক আনুগত্যই নির্ধারণ করছে কার জীবন নিরাপদ থাকবে। নিপীড়নের যন্ত্রগুলো একই আছে-শুধু যাদের হাতে তা পরিচালিত হচ্ছে, তারা বদলে গেছে।

এই চলমান প্রতিশোধ ও সুযোগসন্ধানী রাজনীতি দেশের রাজনৈতিক ও নৈতিক সঙ্কটের প্রতিফলন। পুরনো কিংবা নতুন-দুই পক্ষেরই লক্ষ্য যেন প্রতিহিংসা মেটানো ও ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিল করা, জাতিকে আরোগ্য দেওয়া নয়। মিথ্যা মামলা ও ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায় এখন কেবল রাজনৈতিক কাজ নয়-এটি এক অর্থনৈতিক ব্যবসা, যা ভয়ের উপর দাঁড়িয়ে আছে।

যতদিন পর্যন্ত এই প্রতিহিংসার সংস্কৃতি ধ্বংস না করা যাবে এবং প্রকৃত জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা না হবে, ততদিন পর্যন্ত গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের স্বপ্ন অপূর্ণই থেকে যাবে। গতকাল ও আজকের সকল ভুক্তভোগী-যে দলেরই হোক না কেন-তারা প্রাপ্য ন্যায়বিচার, আরেকটি শোষণের চক্র নয়।


আরো সংবাদ পড়ুন...